আজ রবিবার, ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৭ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং,দুপুর ১:২৭

ফরিদপুর পর্দা কেলেঙ্কারির পর নগরকান্দা হাসপাতালের ওষুধ কেলেঙ্কারি ফাঁস

নগরকান্দা প্রতিনিধি: ফরিদপুরের নগরকান্দা হাসপাতালের সরকারী ওষুধ অভিনব কায়দায় দিনের পর দিন চুরি হচ্ছে। হাসপাতালের ষ্টোরকিপার এ ঘটনায় জড়িত বলে তথ্য প্রমাণে উঠে এসেছে। শুধু ওষুধ চুরির ঘটনায়ই নয় বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর সেচ্ছাচারিতায় নগরকান্দা হাসপাতালটি হয়ে উঠেছে দুর্নীতির অভয়ারণ্য। আর এর নেপথ্য নায়ক হিসেবে কাজ করছে হাসপাতালের ষ্টোরকিপার মিরান হোসেন।

নগরকান্দা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহ-সভপিতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ মনিরুজ্জামান সরদার, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির অন্যতম সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ বদরুদ্দোজা শুভ, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ চুন্নু শেখ নিয়মিত মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে নগরকান্দা হাসপাতাল পরিদর্শনকালে ওধুষ চুরির ঘটনা ধরা পড়ে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়- নগরকান্দা হাসপাতালে কর্মরত ষ্টোরকিপার মিরান হোসেন অলিখিতভাবে নিজেকে হাসপাতালের গড ফাদার হিসেবে দাবী করে সব কিছুই নিজের আয়ত্বে এনে হাসপাতাল পরিচালনা করছে। ষ্টোরকিপার হয়েও নিজের খেয়াল খুশিমত সার্টিফিকেট বাণিজ্য করছে। নগরকান্দা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ নুরুল ইসলাম একজন ভদ্রলোক হওয়ায় ষ্টোরকিপার মিরান হোসেন এ সুযোগটি কাজে লাগায়। মিরান হোসেনের বাড়ী বৃহত্তর নগরকান্দায় হওয়ার সুবাদে বাড়তি সুবিধা পেয়ে নিজেকে হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্টাফদের উপর কর্তৃত্ব খাঁটিয়ে যা খুশি তাই করছেন।
৫০ শয্যা বিশিষ্ট নগরকান্দা হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদের বসার জায়গা না থাকলেও ষ্টোরকিপার মিরানের বসার রুমটি সাজানো হয়েছে পরিপাটি করে। ওই রুমে বসেই তিনি সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিজ দায়িত্বে রেখে খবরদারী করে থাকেন। করেন সার্টিফিকেট বাণিজ্যও।

মিরান হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারী ওষুধ কালো বাজারে বিক্রি করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও তার অভিনব পন্থা কেউ ধরতে পারেনি। গত ২৪ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) নগরকান্দা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ চুন্নু মিয়া আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে ওষুধের ষ্টোর মিলাতে যেয়ে ধরা পড়ে ওষুধের অনিয়ম। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেখানে প্রায় ৮ হাজার এ্যাজিথ্রোমাইসিন ট্যাবলেট উদ্বৃত্ত দেখতে পান। এত ওষুধ উদ্বৃত্ত কেনো জানতে চাইলে ষ্টোর কিপার মিরান হোসেন কোনো সদুত্তোর দিতে পারেননি।

অপর একটি সূত্র জানায়- ষ্টোরকিপার মিরান হোসেন দামী এসব ওষুধ সুবিধামত সময়ে বাজারে বিক্রি করার জন্য মজুত রেখেছে। ওষুধ উদ্বৃত্ত থাকার কারণ খুঁজতে যেয়ে নির্বাহী কর্মকর্তা যে প্রমাণ পান তা দেখে উপস্থিত সকলে বিস্মিত হন। এ্যাজিথ্রোমাইসিন প্রতিটি ট্যাবলেটের বাজার মূল্য- ৩৫ টাকা হওয়ায় আউটডোরে এসব ওষুধ না দিয়েও আউটডোরের প্রেসক্রিবশনে (স্লীপ) ওষুধ ডেলিভারী দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ ওইদিন হাসপাতালের আইটডোরে যতগুলো ¯স্লীপ দেওয়া হয়েছে তার অধিকাংশ স্লীপে এ্যাজিথ্রোমাইসিন দেখানো হয়েছে। বাস্তবে রোগীদের এ্যাজিথ্রোমাইসিন দেওয়া হয়নি। প্রায় প্রতিটি স্লীপের শেষে লেখা হয়েছে এ্যাজিথ্রোমাইসিন ট্যাবলেটটি। এ্যাজিথ্রোমাইসিন লেখাটিও সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের নয়। রোগীগণ তাদের স্লীপের ওষুধ নিয়ে যাওয়ার পর উক্ত ¯স্লীপ সমূহে এ্যাজিথ্রোমাইসিন লিখে রাখা হয়েছে (অন্য হাতের লেখায়)। এ কারণেই ওষুধগুলি ডেলিভারী দেখিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে ওষুধ মজুত রাখা হয়েছে। ওই দিনের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাঃ ফরহাদ হোসেন বলেন- সারা দিনে তিনি প্রায় ২৫ টির মত ¯স্লীপ (প্রেসক্রিবশন) দিয়েছেন। তাতে মাত্র ১ জনকে তিনি এ্যাজিথ্রোমাইসিন লিখেছেন। অন্য প্রেসক্রিবশনগুলো দিয়েছেন জরুরী বিভাগে দায়িত্বরত সেকমোবৃন্দ। দায়িত্বরত সেকমোগনও ইউএনও কে জানায়- ¯স্লীপের নীচে যে এ্যাজিথ্রোমাইসিন লেখা রয়েছে, তা তাদের হাতের লেখা নয়। ডেলিভারী রেজিষ্ট্রারেও রোগীদের পূর্ণাঙ্গ নাম ঠিকানা দেয়া থাকেনা।
উদ্বৃত্ত ৮ হাজার ওষুধের ব্যাপারে মিরান হোসেন ইউএনও কে জানান- ৬টি সাব সেন্টারের জন্য ৬ হাজার এ্যাজিথ্রোমাইসিন ট্যাবলেট জমা রয়েছে। ৮ হাজার ট্যাবলেট থেকে ৬ হাজার ট্যাবলেট সব সেন্টারের জন্য মজুত থাকলেও- আরো ২ হাজার উদ্বৃত্ত এ্যাজিথ্রোমাইসিন ট্যাবলেটের কোনো ব্যাখ্যা ষ্টোরকিপার মিরান দিতে পারেননি।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনয়িম সংক্রান্তে একটি তালিকা লিখে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ নুরুল ইসলামের স্বাক্ষর গ্রহন করে চলে আসেন এবং এ সংক্রান্তে একটি রিপোর্ট তৈরী করে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করেন বলে জানা গেছে।
হাসপাতালে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়- আউটডোরের ¯স্লীপ গুলো ষ্টোরকিপার মিরান হোসেন এনে সেখানে এ্যাজিথ্রোমাইসিন লিখে আবার আউটডোরে রেখে আসেন। এ ভাবেই চলে ষ্টোরকিপার মিরানের প্রতিদিনের নিয়ম মাফিক অনিয়মের রুটিন।
এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ নুরুল ইসলাম এই প্রতিবেদক কে বলেন- ইউএনও মহোদয় উদ্বৃত্ত ওষুধের যে বিষয়টি ধরেছেন তা সঠিক। আমি নিজেই তার সিজার লিষ্টে স্বাক্ষর দিয়েছি। ষ্টোরকিপার মিরান হোসেন হতভম্ব হয়ে একেক সময় একেক কথা বলেছেন। তাই আমি মনে করি ষ্টোর কিপার মিরান হোসেনকে ষ্টোর মিলনোর জন্য আরো সময় দেওয়া প্রয়োজন। আউটডোরের ¯স্লীপের অনিয়মের বিষয় স্বীকার করে তিনি বলেন- আমাদের জনবল কম থাকায় ঠিকমত সব কিছু দেখভাল করা সম্ভব হয় না। আর মিরান যেহেতু আমার ষ্টাফ তাই স্বভাবতঃই আমি তার পক্ষে থাকবো।
হাসপাতাল ব্যবস্থপনা কমিটির সহ-সভাপতি ও উপজেলা চেয়াম্যান মোঃ মনিরুজ্জামান সরদার বলেন- হাসপাতাল পরিদর্শনে যেয়ে আমরা অনিয়ম পেয়েছি। অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতাল ব্যবস্থপনা কমিটির সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ বদরুদ্দোজা শুভ বলেন- হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির মনিটরিং এর অংশ হিসেবে আমরা হাসপাতাল পরিদর্শনে যাই। পরিদর্শনে যেয়ে যে অনিয়ম দেখতে পেয়েছি সে মোতাবেক মাননীয় জেলা প্রশাসক বরাবরে প্রতিবেদন পাঠিয়ে দিয়েছি।

     আরো পড়ুন