আজ বুধবার, ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১১ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং,রাত ১০:৩৬

খুলনায় ঘূর্নিঝড় বুলবুলে ক্ষতিগ্রস্তদের গৃহ নির্মাণ সামগ্রী এখনও পায়নি দুর্গত মানুষেরা


খুলনা প্রতিনিধি: খুলনায় ঘূর্নিঝড় বুলবুলের ২২ দিনেও গ্রামীণ জনপদের দুর্গত মানুষেরা গৃহ নির্মাণ সামগ্রী পায়নি। গরীব মানুষেরা কাঁচা ঘরগুলো মেরামত করতে পারেন নি। তারা ভাঙ্গা ঘরের কোনে পলিথিনের ছাউনি দিয়ে মাথা গুজেছেন। কেউবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছেন।
জেলা ত্রাণ ও পূণর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, খুলনার ২৯ লাখ ৭ হাজার ৫শ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। ৯ হাজার ৪শ ৭৫ টি কাঁচা ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। ৩৭ হাজার ৮শ ২০ টি কাঁচা ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গাছ চাপা পড়ে দাকোপ,রূপসা এবং দিঘলিয়া উপজেলায় ৩ জন নিহত হন।
সূত্রমতে, দুর্গতদের জন্য নগদ ২৫ লাখ টাকা, ৪শ মেট্রিকটন চাল, পাঁচ হাজার পিস শাড়ি, পাঁচ হাজার পিস লুঙ্গি ও চার হাজার বান্ডিল ঢেউটিন বরাদ্দ চেয়ে গত ১০ নভেম্বর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রনালয়ে চাহিদা পত্র পাঠানো হয়েছে। কিন্তু পাওয়া গেছে মাত্র এক হাজার বান্ডিল ঢেউটিন। যা এখনও ত্রাণ গুদামে রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে তা এখনও উত্তোলন হয় নি।
বিভিন্ন স্থানের ইউপি চেয়ারম্যানগণ ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরিতে দেরি করায় দুর্গতদের ঘর সংস্কার কাজ থমকে আছে। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দও নামেমাত্র। প্রাথমিক পর্যায়ে দেয়া নগদ অর্থ সহায়তা দিয়ে শুকনো খাবার কিনে বিতরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সূত্র জানান,ঘূর্নিঝড়ের পূর্ব প্রস্তুতি মূলক ব্যবস্থাপনার আওতায় কয়রায় আড়াই লাখ টাকা, দাকোপে আড়াই লাখ টাকা, পাইকগাছায় দেড় লাখ টাকা, বটিয়াঘাটায় এক লাখ টাকা ও রূপসা উপজেলায় ৫০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেয়া হয়েছিল। এছাড়া ১৬০ মেট্রিকটন চাল ও দু’হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়।
রূপসা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাসরিন আকতার বলেন, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৩শ টি ঘর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আংশিক ক্ষতি হয় ২৫শ ৫৬ টি ঘরের। ১০ হাজার মানুষের ঘর সংস্কারের জন্য মাত্র ৫০ বান্ডিল ঢেউটিন পাওয়া গেছে। কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা পেতে দেরি হওয়ায় গুদাম থেকে এখনও তা উত্তোলন করা সম্ভব হয় নি।
কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের কালনা গ্রামের দিনমজুর আশরাফ মালী (৩৫)। বৃদ্ধা মা , স্ত্রী-সন্তানসহ ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে টিনের ছাউনির মাটির ঘরে বসত করতেন। ঝড়ে চালের টিন উড়ে যায়। দেয়ালের এক পাশ ভেঙ্গে পড়ে। পুকুরের মাছ ভেষে যায়। বাড়ীর ফলজ গাছগুলো ভেঙ্গে পড়ে। তিনি এখন সর্বশান্ত। ভাঙ্গা ঘরের চালে পলিথিন ও খেজুর পাটির ছাউনি দিয়ে স্বপরিবারে মাথা গুজেছেন। তিনি কোনো ত্রাণ সহায়তা পান নি বলে অভিযোগ করেছেন।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে দু’টির চেয়ারম্যান ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তালিকা তৈরির কাজ এখনও শেষ করেন নি। দুর্গতদের মাঝে আগামী দু-একদিনের মধ্যে ঢেউটিন বিতরণ করা সম্ভব হবে।
রূপসা উপজেলার টিএসবি ইউনিয়নের উত্তর খাজাডাঙ্গা গ্রামের কেরামত আলী শেখ (৫০)। দিন মজুরি করে তিনি সংসারের পাঁচ সদস্যের ভরন-পোষন যোগান। কোনো দিন কাজ পান, কোনদিন পান না। ঝড়ে একটি বড় আকারের সিরিস গাছ তার বসত ঘর, গোয়াল ঘর ও রান্না ঘরের উপর উপড়ে পড়ে। মাটির দেয়ালের বসবাসের ঘরটি পুরোপুরি ভেঙ্গে যায়। পরিবারের দু’ সদস্য এখন ওই ভাঙ্গা ঘরের একাংশে বসত করলেও অন্য তিন জন প্রতিবেশির বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছেন। ত্রাণ হিসেবে তিনি ১৫ কেজি চাল ছাড়া কিছুই পান নি।
দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির বলেন, ঝড়ে ইউনিয়নের নয়টি গ্রামের ৪শ কাঁচা ঘর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্যোগের পরের দিনই তিনি উপজেলায় দুর্গতদের তালিকা দিয়েছেন। শুনেছেন-৪০ বাÐিল ঢেউটিন বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু এখনও হাতে পান নি। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১শ৩৫ প্যাকেট শুকনো খাবার ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় নি।
এই উপজেলায় ঝড়ের পূর্ব প্রস্তুতির ব্যবস্থাপনার আওতায় নগদ আড়াই লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। সেই টাকায় শুকনো খাবার কিনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াদুদ জানান। তিনি বলেন, ১৭শ’৫৩ টি কাঁচা ঘর পুরোপুরি ও ৫ হাজার ২শ ২০ টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা নিশ্চিত করতে কিছুটা বিলম্ব হলেও আগামী দু’-এক দিনের মধ্যে ঢেউটিন ও নগদ টাকা বিতরণ করা সম্ভব হবে।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিরুল আজাদ বলেন, গত ১০ নভেম্বর ভোর পাঁচ টা থেকে সকাল পৌনে ১০ টা পর্যন্ত খুলনাঞ্চলে অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। এর গতিবেগ ছিল প্রতি ঘন্টায় সর্বোচ্চ ৭০ কিলোমিটার। সাথে ছিল বৃষ্টিপাত।
জেলা ত্রাণ ও পূণর্বাসন কর্মকর্তা আজিজুল হক জোয়ার্দ্দার দৈনিক আজকের সারাদেশকে বলেন, কয়রায় ২শ৫০ বান্ডিল, দাকোপে ২শ৫০ বান্ডিল, পাইগাছায় ১শ৫০ বান্ডিল, বটিয়াঘাটায় ১শ বাÐিল এবং রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া, ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলায় ৫০ বান্ডিল করে ঢেউটিন বরাদ্দ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা প্রতি বাÐিল টিনের সাথে নগদ তিন হাজার করে টাকা পাবেন।

     আরো পড়ুন