Spread the love

বি এম রাকিব হাসান: উপকূলীয়ঞ্চল সাতক্ষীরার শ্যামনগর, খুলনার কয়রা, পাইকগাছা আর বাগেরহাটের শরণখোলার প্রত্যন্ত গ্রামে পানি কষ্টের বিপন্ন রূপ। কষ্ট নিরাবণে মানুষগুলোর দীর্ঘ পথ পায়ে হাঁটা। সকাল-বিকেল-দুপুর জলের আঁধারগুলো ঘিরে নারী-পুরুষ ও শিশুদের জটলা। কলসি, বালতি, ড্রাম, জগ, যার যা আছে, তা নিয়েই ছুঁটে যান পানির কাছে। সুপেয় পানির সংকটটাই সবচেয়ে বেশি। কোথাও আবার গোসল, রান্নাবান্না আর সেচের পানির কষ্টটাও তীব্র হয়ে ওঠে। অর্থের বিনিময়ে মানুষের পানি কিনতে হয়।
উপকূলের কিছু এলাকায় আগে মাত্র ৬০-৭০ ফুট গভীরে নলকূপ বসিয়ে মিঠা পানি পাওয়া যেত। এখন সেসব স্থানে ১২০ ফুটেও মিলছে না মিঠাপানি। কোন কোন স্থানে ৮-৯ শ ফুট নিচে না গেলে গভীর নলকূপের মিঠা পানি পাওয়া যায় না। এই নলকূপগুলো বসাতে এক লাখ টাকার মতো খরচ হয়। আর প্রতিটি গভীর নলকূপ থেকে ৮০টি পরিবার পর্যন্ত পানি নিতে পারেন। এ হিসাবে দেখা যায় প্রতি নলকূপ থেকে ৩০০ থেকে ৩৫০ জনের পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্তু উপকূলীয় দ্বীপ-চরগুলোর অধিকাংশ স্থানে পর্যাপ্ত গভীর নলকূপ নেই। ফলে সুপেয় পানি সংগ্রহের জন্যে বাসিন্দাদের হাঁটতে হয় দীর্ঘ পথ। বিশেষ করে, এই পানি সংগ্রহের দায়িত্ব থাকে নারী এবং কন্যা শিশুদের। ঘরের অন্য কাজকর্ম বাদ দিয়ে, কিংবা শিশুদের লেখাপড়ার সময় থেকে সময় বাঁচিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
‘লবণে তো আমাদের গ্রাস করে ফেলেছে। মিঠা পানির খুব অভাব। দূর থেকে পানি আনতে হয় কিনে। এক সময় মিঠা পানি পাওয়া যেত ৬০-৭০ ফুট গভীরে। এখন ১২০ ফুট গভীরেও লবণ পানি।’ পানি সংকটের কথা তুলে এভাবে অবস্থার বিবরণ দিচ্ছিলেন খুলনার দাকোপের সুতারখালী ইউনিয়নের কালাবগি গ্রামের মো. ইদ্রিস মোড়লের স্ত্রী আছমা খাতুন।
খুলনার দাকোপের কালাবগি এলাকার ঝুলন্ত পাড়ার জালাল মীরের স্ত্রী বাসিন্দা সকিরন বিবি (৪৫) বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে তিনবেলা ভাত হয়তো পেট ভরে খেতে পারি। কিন্তু প্রায়োজনমত পানি পান করতে পারি। অন্যান্য কাজেও পানি ব্যবহার করতে হয় মেপে। বর্ষাকালে পানির কষ্ট কম থাকে। কারণ, তখন বৃষ্টির পানি পাই। তখন পানি ব্যবহার করি এবং সংরক্ষণ করেও রাখি। তবে ধরে রাখা বৃষ্টির পানিটুকু শেষ হয়ে গেলে শুকনো মৌসুমে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়।’
বাসিন্দারা জানালেন, লবণাক্ত এলাকা বলে এখানে খাবার পানির সংকট তীব্র। আইলার পরে নদীর পানিতেও লবণাক্ততা বেড়েছে বলে আমরা অনুভব করি। এলাকায় নলকূপ বসলেও তা থেকে লবণ পানি ওঠে। ১৬০-১৬৫ ফুট পাইপ বসিয়েও দেখা গেছে নলকূপ থেকে লবণ পানিই ওঠে। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে নদীর পানি মিষ্টি থাকে। তখন পুকুরের পানিও মিষ্টি থাকে। এরপর থেকে লবণাক্ততা বাড়তে থাকে।
ঝুলন্ত পাড়ার কয়েকটি স্থানে পানির পাকা ফিল্টার চোখে পড়লেও সেগুলো অকেজো। পানির সংকট নিরসনে বিভিন্ন সময়ে হয়তো এগুলো দেওয়া হয়েছিল বেসরকারি উদ্যোগে। ইটবালুর এ ফিল্টারে পানি ধরে রাখা যাচ্ছে না। প্লাস্টিকের ড্রামকেই পানি সংরক্ষণের টেকসই মাধ্যম বলে মনে করেন এলাকার মানুষেরা। কিন্তু সব পরিবারের পক্ষে এই ড্রাম পর্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। এনজিও থেকে কিছু ড্রাম দেওয়া হলেও তার সংখ্যা হাতে গোনা।


Spread the love