আজ বুধবার, ২৫শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ৮ই এপ্রিল, ২০২০ ইং,দুপুর ১:৩৩

মহান স্বাধীনতা দিবস আজ

বিশেষ প্রতিনিধি: আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। ৪৯ বছর আগে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনা ঘটে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের পটভূমিতে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগমুহূর্তে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার। দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। আজ আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী ৩০ লাখ শহীদকে, স্মরণ করি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও চার জাতীয় নেতাকে। 

স্বাধীনতার প্রথম লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খলমুক্তি। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সেটি অর্জিত হয়েছে। দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠন; যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে। 

৪৯ বছর পর আত্মজিজ্ঞাসা করলে দেখব স্বাধীনতার অনেক লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষাই অপূর্ণ রয়ে গেছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, খাদ্য উৎপাদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ অনেক ক্ষেত্রে দেশ অনেক এগিয়েছে। আর্থসামাজিক কাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি হয়েছে। বহুমুখী যমুনা সেতুর পর আমরা পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে যাচ্ছি। কিন্তু স্বাধীনতার যে স্বপ্ন, অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদা তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সুযোগ নিশ্চিত করা যায়নি। 

পাকিস্তানি আমলে আমাদের রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামের মূল কথা ছিল বৈষম্যের অবসান। কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই বৈষম্য আরও বেড়েছে। কতিপয় লোকের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত। উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও জনসংখ্যার প্রায় এক–চতুর্থাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। এর অর্থ হলো উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছায়নি। আমরা যদি সত্যি সত্যি একটি ন্যায় ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে হবে। এর পাশাপাশি বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ, শেয়ারবাজারে কারচুপি, সরকারি সম্পদ লুটপাট এবং বিদেশে অর্থ পাচারসহ যেসব অনাচার চলছে, তা কোনোভাবেই স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। 

স্বাধীনতার মূল স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। দিনে দিনে যেখানে গণতন্ত্র সংহত হওয়ার কথা, সেখানে তা সংকুচিত হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা কার্যত ধসে পড়েছে। স্বাধীন মতপ্রকাশ ও বাক্‌স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত হয়েছে। সংবিধান নাগরিককে যে মৌলিক অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে, পূর্বাপর সরকারগুলো নানা কালো আইনের মাধ্যমে তা খর্ব করার চেষ্টা চালিয়েছে এবং তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। বিএনপির আমলে আইসিটি আইন পাস হলে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ জোরালো প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তারা যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন জারি করেছে, সেটি আরও বেশি নিবর্তনমূলক। আগামী বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপিত হবে। বাংলাদেশ কি শুধু অর্থনীতির সূচকে এগিয়ে থেকেই সন্তুষ্ট থাকবে, নাকি গণতন্ত্র আইনের শাসন, মানবাধিকার ও বাক্‌স্বাধীনতার সূচকেও এগোনোর পথ ধরবে?

এবারের স্বাধীনতা দিবসটি এমন সময়ে এসেছে, যখন দেশ করোনাভাইরাসে প্রায় অবরুদ্ধ। সরকার স্বাধীনতা দিবসের সব কর্মসূচি বাতিল ঘোষণা করেছে। আনুষ্ঠানিকতার ঘেরাটোপে বন্দী না রেখে আমরা যদি স্বাধীনতা দিবসের মূল চেতনার দিকগুলোকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, সেটা হবে এই মহান দিবস উদ্‌যাপনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। সমগ্র বিশ্ব ও দেশের এই কঠিন সময়ে দলমত-নির্বিশেষে সবাই করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ে শামিল হবে, নিজে নিরাপদ থাকবে এবং অন্যকে নিরাপদ থাকতে সহায়তা করবে—এটাই হোক আমাদের এবারের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার।

     আরো পড়ুন