আজ বৃহস্পতিবার, ২২শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৬ই আগস্ট, ২০২০ ইং,সন্ধ্যা ৬:৩৬

আজ শুক্রবার


মো. বাকী বিল্লাহ খান পলাশ: ‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;
অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।’

মৃত্যুর ফেরেস্তা মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয়ে যদি এ দিনটিতে মৃত্যুর তাকিদও দেয় তবুও ‘স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার’কে ঈদ হিসাবেই মেনে নেবেন ‘আমি, দূরগামী’ কাব্যগন্থের লেখক কবি আল মাহমুদ। যে দিনটিতে মহান আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন বিশ্বের প্রথম মানব আদি পিতা হযরত আদম (আ.) কে। যে দিনটিতে ফুঁক দেয়া হবে শিঙ্গায় এবং সংগঠিত হবে কিয়ামত। যে দিনটি আল্লাহর নিকট অতি মর্যাদার ইসলামে মহান ও ফজিলতময় সেই দিনটি শুক্রবার (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং. : ১০৮৪)।

কুরআন-হাদিসে শুক্রবার :
পবিত্র কুরআন কারীমে এই দিনটি নিয়ে একটি পূনাঙ্গ সুরা রয়েছে যার নাম সুরা ‘জুম্আ’।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, সূর্য উদিত হয় এমন দিনগুলোর মধ্যে জুমু‘আর দিন হলো সর্বোত্তম দিন।
১. এই দিনে আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা হয়েছে। ২. এই দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে ৩. একই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে আনা হয়েছে (মুসলিম, হাদিস নং.: ৮৫৪)। ৪. এই দিনে আদম (আ.) পৃথিবীতে অবতরণ করেন। ৫. এ দিনেই তাঁর তওবা কবুল করা হয়েছিল। ৬. সপ্তাহের এদিনেই তিঁনি মৃত্যু বরণ করেন (আবু দাউদ, হাদিস নং. : ১০৪৬)। ৭. একই দিনেই শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে এবং কিয়ামত সংগঠিত হবে (আবূ দাউদ, হাদিস নং. : ১০৪৭)। ৮. পরিশেষে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত পবিত্র ফেরেশতাগণ, আকাশ-বাতাস, পাহাড়-পর্বত, পৃথিবী এ দিনটিকে ভয় করে (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং. : ১০৮৪, ১০৮৫, ১৬৩৬)।

দিনটির ফজিলত :
শুক্রবার দিনটি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ দিন। এ দিনটি মহান আল্লাহর নিকট অতি মর্যাদাসম্পন্ন (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং. : ৩/৪৩০)।
১. শুক্রবারের ফজিলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, যে ব্যক্তি জুমু‘আর দিন ভালোভাবে গোসল করে। অতঃপর সকাল সকাল পায়ে হেঁটে মসজিদে যায় এবং (আগে ভাগে নফল ছালাত শেষে) ইমামের কাছাকাছি বসে ও মনোযোগ দিয়ে খুৎবার শুরু থেকে শুনে এবং অনর্থক কিছু না করে, তবে তার প্রতি পদক্ষেপে রয়েছে এক বছরের ছিয়াম ও ক্বিয়ামের অর্থাৎ দিনের ছিয়াম ও রাতের নফল ছালাতের সমান নেকী (আহমাদ, হাদিস নং. : ১৬২১৭, তিরমিযী, হাদিস নং. : ৪৯৬, মিশকাত, হাদিস নং. : ১৩৮৮)।
২. তিনি আরো বলেন, জুমু‘আর দিন ফেরেশতাগণ মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন ও মুছল্লীদের নেকী লিখতে থাকেন। এদিন যে ব্যক্তি প্রথম অক্তে মসজিদে এল, সে যেন একটি উট দান করল। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় সময়ে এল, সে যেন একটি গাভী দান করল। যে ব্যক্তি তৃতীয় সময়ে এল, সে যেন একটি শিংবিশিষ্ট দুম্বা দান করল। যে ব্যক্তি চতুর্থ সময়ে এল, সে যেন একটি মুরগী দান করল। আর যে ব্যক্তি পঞ্চম সময়ে এল, সে যেন একটি ডিম দান করল। অতঃপর খত্বীব দাঁড়িয়ে গেলে ফেরেশতাগণ দফতর গুটিয়ে ফেলেন ও খুৎবা শুনতে থাকেন (বুখারী হাদিস নং. : ৮৮১, মুসলিস হাদিস নং. : ৮৫০)।
৩. অপর এক বর্ণনায় রয়েছে রাসূল (ছা.) বলেন, যে ব্যক্তি জুমু‘আর দিনে ভালোভাবে পবিত্র হলো অতঃপর মসজিদে এল, মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শুনতে চুপচাপ বসে রইল, তার জন্য দুই জুমু‘আর মধ্যবর্তী এ সাত দিনের সাথে আরো তিন দিন যোগ করে মোট দশ দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে খুৎবার সময় যে ব্যক্তি পাথর, নুড়িকণা বা অন্য কিছু নাড়াচাড়া করল সে যেন অনর্থক কাজ করল (মুসলিম, হাদিস নং. : ৮৫৭)।
৪. ইবনুল কায়্যিম (র.) বলেন, অন্য মাসের তুলনায় রমযান মাসের দানের সাওয়াব যেমন বেশি তেমনি শুক্রবারের দান-খয়রাতের ফজিলত অন্য দিনের তুলনায় বেশি (যাদুল মা’আদ)।
৫. এদিনে এমন একটি সময় আছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা চায়, তা-ই তাকে দেওয়া হয়। আর এ সময়টি হলো জুমু‘আর দিন আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত (বুখারী, হাদিস নং. : ৯৩৫, মুসলিম, হাদিস নং. ৮৫২)।
৬. যে ব্যক্তি জুমু‘আর দিন সুরা কাহাফ্ পড়বে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য দুই জুমু‘আর মধ্যবর্তী সময়কে আলোকিত করে দেবেন (জামেউস সাগীর, ৬৪৭০)।
৭. যে ব্যক্তি জুমু‘আর দিন সুরা কাহাফ্রে প্রথম দশ আয়াত পড়বে, সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপত্তা লাভ করবে (মুসলিম)।
৮. শুক্রবার জুমু‘আর নামাজে যাওয়ার আগে নখ কাটা সুন্নত (শরহুস সুন্নাহ, হাদিস নং. : ৩০৯১)। হাদিস শরীফে আছে, যে ব্যক্তি জুমু‘আর দিন নখ কাটবে পরবর্তী জুমু‘আ পর্যন্ত সমস্ত মছীবত হতে আল্লাহ্ তাআলা তাকে হেফাজত করবেন (মুসলিম)।

শুক্রবার নিয়ে আরো কিছু :
ক. শুক্রবারেই কবর জিয়ারত :
কবর জিয়ারত করা যায়েজ এবং সুন্নত। এ ব্যাপারে রাসূল (ছা.) আমাদের উৎসাহ প্রদান করেছেন। হাদিসে এসেছে, বুরাইদা আসলামী মহানবী (ছা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি তোমাদের করব জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু আমাকে আমার মাতার কবর জিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তোমরা তোমাদের মৃতদের কবর জিয়ারত কর। কেননা তা তোমাদের আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং. : ১০৭)।
সাধারণত শুক্রবার জুমু‘আর নামাজের পর মুসল্লিগণ গোরস্থানে কবর জিয়ারত করতে যান এবং সেখানে যথেষ্ট ভিড় লক্ষ করা যায়। এথেকে প্রশ্ন এসে যায় যে, শুক্রবারে করব জিয়ারত করাকি আবশ্যক এবং অধিক ছোয়াবের কাজ। এ সম্পর্কে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, শুক্রবার জুমু‘আর ছালাতের পর অবসর রয়েছে সুতরাং এ সময় কোন ব্যক্তি কখনো কখনো কবর জিয়ারত করতে পারেন কিন্তু এটাকে শুক্রবারের অবশ্য করণীয় কাজ বা এটাকে সুন্নত বানিয়ে ফেলার কোন সুযোগ নেই। কেননা কুরআন বা হাদিসে করব জিয়ারতের জন্য শুক্রবারকে নির্ধারণ করা বা শুক্রবারের নির্দেশিত আমলগুলোর মধ্যে কোথাও করব জিয়ারতের কথা উল্লেখ নেই।
তাছাড়া শুধু শুক্রবার কবর জিয়ারত করা সম্পর্কে যে হাদীস বর্ণিত হয়েছে তা জাল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, উক্ত হাদিস এর সনদে মুহাম্মদ ইবনু নু’মান নামের যে রাবী রয়েছেন তিনি অপরিচিত এবং ইয়াহইয়া নামের রাবী মিথ্যুক (সিলসিলা যঈফাহ, হাদিস নং. : ৫৬০৫, মিশকাত, হাদিস নং. : ১৬৭৬)।

খ. নফল রোজা শুক্রবারে রাখা :
শুক্রবার হলো সাপ্তাহিক ঈদের দিন (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং. : ১০৯৮)। নফল রোজা রাখার জন্য শুক্রবারকে নির্ধারণ বা নিদিষ্ট করে নেয়া নিষেধ। তবে কেউ যদি বৃহষ্পতি এবং শুক্রবার অথবা শুক্র ও শনিবার রোয়া রাখেন অথবা আইয়ামুল বিজের অর্থাৎ প্রত্যেক আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোয়া পালন করতে গিয়ে যদি সেটা শুক্রবারে পড়ে যায় তবে তা যায়েজ। এ সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত রাসূল (ছা.) ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ জুমু‘আর আগে বা পরে একদিন মিলানো ব্যতিত শুধুমাত্র জুমু‘আর দিন রোয়া রেখো না (সহীহ বুখারী, হাদিস নং. : ১৮৮৪, মুসলিম, হাদিস নং. : ২৫৪৫)।

গ. শুক্রবারে মৃত্যু হলে জান্নাত :
অনেকেই এ কথা বলে থাকেন যে, শুক্রবারে জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয় সুতরাং এদিন কেউ মৃত্যু বরণ করলেই বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে। কিন্তু উক্ত মর্মে কোন দলীল কোরআন বা হাদিস কোথাও খুজে পাওয়া যায় না। বরং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, যেকোন মুসলমান জুমু‘আর দিনে কিংবা জুমু‘আর রাতে মৃত্যুবরণ করবে। নিশ্চই আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের ফেতনা থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন (তিরমিজী, হাদিস নং. :১০৯৫, মিশকাত, হাদিস নং. :১৩৬৭)। উপর্যুক্ত হাদিসের আলোকে ইসলামি স্কলারগণ বলে থাকেন যে, শুক্রবারে মৃত্যুবরণ করলে বিনা হিসাবে জান্নাত বা কিয়ামত পর্যন্ত কবরের আযাব মাপ এ কথা বলার কোন সুযোগ নেই। এ সম্পর্কে মুল্লা আলী কারী (রহ.) তাঁর ‘মিনাহুর রওদিল আযহার ফি শরহে ফিকহুল আকবার’ (পৃষ্ঠা : ২৯৫-২৯৬) এ বলেন, জুমু‘আর দিনে জুমু‘আর রাতে যে মারা যাবে তার থেকে কবরের আজাব উঠিয়ে নেওয়া হবে এটা মোটামুটি প্রমানিত। তবে কিয়ামত পর্যন্ত আর আজাব ফিরে আসবে না এ কথার কোন ভিত্তি আমার জানা নেই।’

ঘ. শুক্রবারে ঈদ হলে :
শুক্রবারে ঈদ হলে ঈদের সালাত আদায় করার পর জুমু‘আর ছালাত আদায় করতে হবে কিনা বিষয়টি নিয়ে অনেকেই দ্বিধান্বিত থাকেন। বিষয়টির জবাব উল্লিখিত হয়েছে মাসিক ‘আত-তাহরীক’ ফৎওয়া সংকলন ১৮ তম বর্ষ সংখ্যার ৫৮ নং. পৃষ্ঠায়। সেখানে বলা হয়েছে, জুমু‘আ ও ঈদ একই দিন হ’লে ঈদের ছালাত আদায় করার পর জুমু‘আর ছালাত আদায় করা ইচ্ছাধীন বিষয়। তবে জুমু‘আর ছালাত আদায় না করা হলে যোহরের ছালাত আদায় করতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) এর যুগে ঈদ ও জুমু‘আ একই দিন হ’লে তিনি সকলকে নিয়ে ঈদের ছালাত আদায় করতেন। অতঃপর বলতেন, এক্ষণে জুমু‘আ পড়তে আসা বা না আসা তোমাদের ইচ্ছাধীন বিষয়। তবে আমরা জুমু‘আ পড়ব’ (আবু দাউদ, হাদিস নং. : ১০৭৩)।

শুক্রবার দিনটিকে সম্মান করার জন্য ইহুদী-নাসারাদের উপর ফরয করা হয়েছিল, কিন্তু তারা মতবিরোধ করে এ দিনটিকে প্রত্যাখ্যান করে। অতঃপর ইহুদীরা শনিবার এবং খ্রিষ্টানরা রবিবারকে তাদের ইবাদতের দিন বানায়। অবশেষে আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য শুক্রবার দিনটিকে মহান ও ফযীলতের দিন হিসাবে দান করেন। যা উম্মতে মুহাম্মদী সদরে গ্রহণ করে নেয় (বুখারী, হাদিস নং. : ৮৭৬, মুসলিম, হাদিস নং. : ৮৫৫)। সুতরাং একজন মুসলমান হিসাবে শুক্রবার দিনটি থেকে আমরা যেন সর্বোচ্চ কল্যাণ লাভ করতে পারি আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। আমিন।

সহায়ক গ্রন্থ ও উৎস সমূহ :
১. প্রশ্নোত্তরে জুমু‘আ ও খুৎবা – অধ্যাপক মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
২. ফৎওয়া সংকলন, মাসিক আত-তাহরীক, ১৮ ও ১৯ তম বর্ষ
৩. দ্বীনী প্রশ্নোত্তর – আব্দুল হামীদ ফাইযী আল-মাদানী
৪. জিজ্ঞাসা ও জওয়াব, মাসিক আল-ইখলাছ, ডিসেম্বর ২০১৯ সংখ্যা
৫. শুক্রবারে মৃত্যু বরণ করলে কিয়ামত পর্যন্ত কবরের আযাব কি বন্ধ থাকে? – আল মাজলিসুল ইলমী
৬. আপনি জানেন কি ঈদের দিন বা জুমু‘আর দিন কবর জিয়ারত করা কি সুন্নত না বেদাত – শায়খ আহমাদুল্লাহ
লিংক : (https://www.youtube.com/watch?v=I6euayFF44c)

Palashkhan65@gmail.com

রহিমা ফাইন্ডেশন

     আরো পড়ুন