Spread the love

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ‘হঠাৎ কইর‌্যা বানের পানিতে বাঁধ ভাইঙ্গ্যা ঘরবাড়ি তলায় গেছে। ঘরের মাল-ছামানাও কিছু বাইর করতি পারি নাই। পাঁচজন ছাওয়াল-মাইয়ার সঙ্গে গরু-বাছুর নিয়্যা রাস্তার উপর পলিথিন আর বাঁশের বেড়া দিয়্যা রইছি। এখন কয়ডা টিন পাইলে ঘরডা তুলতি পারতাম।’

আক্ষেপ করে বলছিলেন ফরিদপুর শহরতলীর শহরতলীর হরিসভার বাসিন্দা নার্গিস খাতুন। বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন উঁচু সড়কে। কিন্তু পড়ে গেছেন চরম দুর্ভোগে।

একই অবস্থা ফরিদপুর সদর, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী বিভিন্ন বাঁধে পরিবার পরিজনসহ আশ্রয় নেওয়া বন্যার্তদেরও। গত দশদিন ধরে খোলা আকাশের নিচে রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দিনযাপন করছেন কৃষক ও খেটে খাওয়া বিভিন্ন পেশার নিম্ন আয়ের মানুষগুলো। পলিথিন আর বাঁশ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ছাউনি যে কখন বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যায় সে ভাবনাতে তাদের ঘুম আসে না।

শহরের টিবি হাসপাতাল মোড় হাসপাতাল মোড় থেকে পূর্ব দিকে চলে যাওয়া গুচ্ছ গ্রামের সড়কেও এখন শুধুই হতদরিদ্র পরিবারের বাস। বন্যায় ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় এসব পরিবার এসে আশ্রয় নিয়েছে উঁচু সড়কটিতে। সেখানকার মানুষের দুর্ভোগও চরমে উঠেছে।

শহররক্ষা বাঁধে আশ্রয় নেওয়া কোবাত শেখ জানান, স্ত্রী ও তিন সন্তানের সঙ্গে পালের গরু, ছাগল ও হাস-মুরগি নিয়ে এখানে বসত গড়েছেন। এখানে আসার পর একবার এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান কিছু চাল আর শুকনো খাবার দিয়ে গেছেন। তাতে তো আর সকলের পেট বাঁচে না ।

চলমান বন্যায় বানভাসি মানুষের মাঝে এখন শুধুই এমনই হাহাকারের চিত্র। গত দশদিন ধরে পানিবন্দি ওই তিন উপজেলার ২০টি ইউনিয়নের ২০ হাজার পরিবার। সড়ক উপচে ও বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে এসব উপজেলার আরো বিস্তীর্ণ এলাকা। আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদের পানি বেড়ে বিভিন্ন খালনালা দিয়ে পানি প্রবেশ করেছে পার্শ্ববর্তী ভাঙ্গা ও নগরকান্দা উপজেলায়ও। সব মিলিয়ে পাঁচটি উপজেলার ৩০টি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

এদিকে গত ২৪ ঘন্টায় পদ্মায় পানি আবারো বেড়ে বিপৎসীমার ১০৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নতুন নতুন এলাকায় পানি প্রবেশ করছে। তাই বেসরকারি সূত্রের দাবি, দ্বিতীয় দফা বন্যায় সাত উপজেলার ৫৪১টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে জেলায় পানিবন্দি দেড় লক্ষাধিক মানুষ। জেলার ১১টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রেও সাত হাজার মানুষ তাদের গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্লাবিত এলাকায় বিভিন্ন উচু সড়ক ও বেড়িবাঁধে আরো কয়েক হাজার পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ জানান, গত বুধ ও বৃহস্পতিবার পদ্মার পানি একটু কমলেও শুক্রবার তা আবার বেড়েছে। বর্তমানে গোয়ালন্দ পয়েন্টে বিপৎসীমার ১০৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বন্যার্তদের মাঝে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, বানভাসি মানুষদের জন্য শুক্রবার (২৪ জুলাই) পর্যন্ত ৫৫০ মেট্রিকটন চাল, সাত হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও নগদ সাত লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব সামগ্রী সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। ত্রাণের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। প্রয়োজনে বরাদ্দ আরো বাড়ানো হবে।

শুক্রবার দুপুরে ফরিদপুর শহররক্ষা বাঁধের একটি অংশ ভেঙে প্লাবিত সাদিপুর এলাকার দুর্গত নারীদের মাঝে খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ অব্যহত রেখেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নন্দিতা সুরক্ষা।


Spread the love